মনের যত কথা
মানুষ প্রতিদিন আহার করে। কিন্তু খুব কম মানুষই বোঝে,আহার কেবল দেহের প্রয়োজন নয়, এটি আত্মারও এক গভীর সাধনা।বেদে বলা হয়েছে, “আহার”শব্দটি এসেছে ‘আ + হৃ’ ধাতু থেকে, যার অর্থ- গ্রহণ করা।
অর্থাৎ, মানুষ শুধু মুখ দিয়েই খায় না – সে চোখ দিয়ে দেখে, কান দিয়ে শোনে, নাক দিয়ে গন্ধ নেয়, ত্বক দিয়ে অনুভব করে, আর মন দিয়ে চিন্তা করে। এই প্রতিটি “গ্রহণ”ই এক একটি আহার।
🔹মানুষ প্রতিদিন শুধু অন্ন গ্রহণ করে না; সে রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস, স্পর্শ ও ভাব, এই ছয় রকম আহারেই বেঁচে থাকে।এই সমস্ত আহার মিলিয়েই গড়ে ওঠে মানুষের মন, চেতনা, চরিত্র ও জীবন।
উপনিষদে তাই বলা হয়েছে –
“যদন্নং তদ্মনঃ”(ছান্দোগ্য উপনিষদ ৬.৫.৪) -যেমন আহার, তেমন মন।
🔹মানুষ কেবল দেহসত্তা নয়, তার ভিতরে আছে মন, বুদ্ধি ও আত্মা।এই বহুমাত্রিক সত্তার প্রতিটি স্তরেরও নিজস্ব আহার আছে। দেহ ভাতজল চায়, মন চায় ভাব, আর আত্মা চায় সত্যের স্পর্শ।
🔹চক্ষুর আহার হলো দৃশ্য।
চোখ যা দেখে, তাই চিত্তে ছাপ ফেলে। শুভ দর্শন অন্তরকে উজ্জ্বল করে তোলে, অশুভ দর্শন চেতনাকে মলিন করে। দৃষ্টির পবিত্রতাই মনের শান্তির ভিত্তি।
🔹কানের আহার হলো শব্দ।
মন্ত্র, সংগীত ও সৎবাণী মনকে স্থির ও নির্মল করে; কলহ, নিন্দা ও অশুভ বাক্য মনকে অস্থির করে তোলে। শ্রবণই পারে অন্তরকে স্বর্গে তুলতে বা নীচে নামাতে।
🔹নাসিকার আহার হলো গন্ধ।
চন্দন, ফুল বা ধূপের বিশুদ্ধ সুবাস চিত্তে প্রশান্তি আনে; অশুচি গন্ধ মনকে ভারাক্রান্ত করে। গন্ধই সূক্ষ্মভাবে প্রাণশক্তিকে উপরে তোলে বা নীচে নামায়।
🔹জিহ্বার আহার হলো রস।
পরিমিত ও পবিত্র আহার দেহে ভারসাম্য আনে, মনে স্থিরতা আনে।তাই বলা হয় – *“আহারশুদ্ধৌ সত্ত্বশুদ্ধিঃ”* , আহার শুদ্ধ হলে মনও শুদ্ধ হয়।
🔹ত্বকের আহার হলো স্পর্শ।
স্নেহময় স্পর্শ হৃদয়কে প্রশান্ত করে, রূক্ষ বা হিংস্র স্পর্শ অস্থিরতা জাগায় ,ত্বক শুধু স্পর্শ বোঝে না ,সে প্রেমও অনুভব করে।
🔹মনের আহার হলো ভাব।
যে চিন্তা মন গ্রহণ করে, সে-ই তার রূপ নেয়। পবিত্র চিন্তা মানুষকে ঈশ্বরের দিকে টানে, অশুভ ভাব তাকে অন্ধকারে আবদ্ধ রাখে।মনই সকল আহারের দর্পণ-যা গ্রহণ করে, তাই সে হয়ে ওঠে। তাই বলা হয় – *যেমন দেখা, তেমন ভাব; যেমন ভাব, তেমন জীবন।
🔹উপনিষদে বলা আছে, আহারের চার প্রকার – ভোজ্য, পেয়, লেহ্য ও চোষ্য
যা চিবিয়ে খাওয়া হয়, তা ভোজ্য;
যা পান করা হয়, তা পেয়;
যা চেটে নেওয়া হয়, তা লেহ্য;
আর যা চুষে নেওয়া হয়, তা চোষ্য
🔹এই চতুর্বিধ আহার দেহকে শক্তি দেয়, প্রাণকে পুষ্ট করে। কিন্তু দেহেরও বাইরে আছে এক সূক্ষ্ম দেহ- মন, বুদ্ধি, চেতনা, যার আহার অদৃশ্য হলেও কার্যকারিতা গভীর।অশুদ্ধ খাদ্য যেমন শরীরকে নষ্ট করে, তেমনি অশুভ চিন্তা, অশুচি দৃশ্য ও কু-শ্রবণ আত্মাকে কলুষিত করে।
🔹ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় আহারকে তিন প্রকারে বিভাজন করেছেন- *সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক।*
🔹সাত্ত্বিক আহার নির্মল, পবিত্র প্রাণবর্ধক- যা দেহে শক্তি আনে, মনে শান্তি আনে, আত্মাকে স্থির করে।
*“আয়ুঃসত্ত্ববলারোগ্যসুখপ্রীতিবিবর্ধনাঃ।*
*রস্যাঃ স্নিগ্ধাঃ স্থিরা হৃদ্যা আহারাঃ সাত্ত্বিকপ্রিয়াঃ॥”(গীতা ১৭.৮)
🔹রাজসিক আহার উত্তেজক, ঝাল, অম্ল বা তীক্ষ্ণ- যা দেহে উত্তাপ জাগায়, মনে অস্থিরতা আনে, আর অহংকার বৃদ্ধি করে।
“কট্বম্ললবণাত্যুষ্ণতীক্ষ্ণরূক্ষবিদাহিনঃ।
*আহারাঃ রাজসসস্তেষাং দুঃখশোকাময়প্রদাঃ (গীতা ১৭.৯)
🔹তামসিক আহার বাসি, দুর্গন্ধযুক্ত বা প্রাণহীন- যা জড়তা, নিদ্রা ও অলস্য বৃদ্ধি করে, চেতনাকে নিম্নে নামায়।
*“যাতযামং গতরসং পূতিম পর্যুষিতং চ যৎ।*
উচ্ছিষ্টমপিচামেধ্যম্ ভোজনং তামসপ্রিয়ম্॥” (গীতা ১৭.১০)
🔹এই তিন প্রকার আহার কেবল দেহকেই নয়, মন ও আত্মাকেও প্রভাবিত করে।
সাত্ত্বিক আহার মানুষকে নির্মল করে, রাজসিক আহার উত্তেজিত করে, আর তামসিক আহার জড় করে ফেলে।
🔹ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হয়েছে –
“আহারশুদ্ধৌ সত্ত্বশুদ্ধিঃ। সত্ত্বশুদ্ধৌ ধ্রুয়া স্মৃতিঃ।”
অর্থাৎ, আহার শুদ্ধ হলে মন শুদ্ধ হয়, মন শুদ্ধ হলে স্মৃতি স্থির হয়, আর স্মৃতি স্থির হলে মানুষ সত্য উপলব্ধি করে। এখানে “আহার” কেবল খাদ্য নয়, ইন্দ্রিয়ের প্রতিটি গ্রহণই এর অন্তর্ভুক্ত।
🔹যে ব্যক্তি তার দেখা, শোনা, অনুভব ও চিন্তাকে শুদ্ধ রাখে, সে ধীরে ধীরে আত্মজ্ঞান লাভ করে।আহার মানে কেবল ভোজন নয় -এটি এক *যোগসাধনা।* জীবন আসলে এক ধারাবাহিক গ্রহণের পথ -আমরা যা দেখি, শুনি ও ভাবি, তা-ই আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ে।অশুভ দেখা, শোনা ও চিন্তা অন্তরকে বিষাক্ত করে; শুভ গ্রহণ মনকে দেবতার আসন করে তোলে।
🔹তৈত্তিরীয় উপনিষদে বলা আছে –
“অন্নং ব্রহ্মেত্যুপাসীত”
অর্থাৎ, আহারকেই ব্রহ্মরূপে উপাসনা করো। কারণ আহারই জীবন, আর জীবনই ঈশ্বরের প্রকাশ। যে আহারকে পবিত্র মনে গ্রহণ করে, সে আসলে ঈশ্বরকেই আহ্বান করে।
🔹ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন – “যুক্তাহারবিহারস্য যুক্তচেষ্টস্য কর্মসূ। যুক্তস্বপ্নাববোধস্য যোগো ভবতি দুঃখহা॥”(গীতা ৬.১৭)
অর্থাৎ, যার আহার, ব্যয়, নিদ্রা ও জাগরণ সংযমে ও শৃঙ্খলায় আবদ্ধ, তিনিই প্রকৃত যোগী; তিনিই দুঃখ থেকে মুক্ত হন।
🔹অতএব, আহারের অর্থ কেবল “খাওয়া” নয় – এটি এক অন্তর্গত সাধনা।ইন্দ্রিয়ের সংযম, চিন্তার পবিত্রতা ও হৃদয়ের নির্মলতাতেই নিহিত প্রকৃত আহারশুদ্ধি।যে মানুষ তার গ্রহণকে শুদ্ধ রাখে, সে ধীরে ধীরে ব্রহ্মচেতনায় জেগে ওঠে।
🔹জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই এক আহারের মুহূর্ত -আমরা যা দেখি, তা-ই আমাদের দৃষ্টি গড়ে; যা শুনি, তা-ই আমাদের চেতনা গড়ে;যা ভাবি, তা-ই আমাদের চরিত্রে রূপ নেয়।
🔹তাই আহারকে শুদ্ধ করা মানে শুধু শরীর নয় – আত্মাকেও নির্মল করা।বেদের ঋষিরা বলেছেন – “যে আহার মনকে প্রসন্ন করে, সেই আহারই শ্রেষ্ঠ আহার।”
🔹প্রতিটি গ্রহণই এক একটি উপাসনা। চক্ষু যখন শুভ দেখে, শ্রোত্র যখন পবিত্র শব্দ শুনে, মন যখন শান্ত ভাবনায় ভরে ওঠে -তখন মানুষ শুধু জীবিত নয়, সে জাগ্রত, সচেতন ও দেবত্বময় হয়ে ওঠে।এই শুদ্ধতাই প্রকৃত যোগ, এই সংযমই সত্য ভক্তি,আর এই আহারশুদ্ধিই – আত্মজ্ঞানলাভের প্রথম ধাপ।
♻️সুতরাং এই আমিষ নিরামিষ না দেখে বুঝতে হবে কোন খাবারটি আমাদের দেহ ও মনকে নির্মল রাখতে প্রয়োজন সেটি গ্রহন করতে হবে। মাছ খেলেই ভগবান চলে যাবে আর ডাল, সবজি খেলেই ভগবান প্রাপ্ত হবে বিষয়টি এত সহজ নয়।

পোষ্টটি লিখেছেন: নীরব পথিক

নীরব পথিক এই ব্লগে 28 টি পোষ্ট লিখেছেন .