মনের যত কথা

জীবন কখনো সহজ নয়—এটি সংগ্রাম, ব্যর্থতা এবং অসম্ভব চ্যালেঞ্জের মাঝে গড়ে ওঠে। কিন্তু কিছু মানুষের জীবনী পড়লে আমরা বুঝতে পারি যে, আমাদের অভিযোগগুলো কত ছোট। এই ১০ জনের জীবনী অনুপ্রেরণার উৎস, যা দেখায় কীভাবে দুর্দশা থেকে উঠে দাঁড়ানো যায়। আমি প্রত্যেকের সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিস্তারিত বর্ণনা দিচ্ছি, যাতে তাদের সংগ্রাম এবং সাফল্য স্পষ্ট হয়। এগুলো পড়লে আপনার জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাবে।

১. হেলেন কেলার (Helen Keller)

হেলেন কেলার ১৮৮০ সালে আমেরিকার আলাবামায় জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ১৯ মাস বয়সে একটি রোগের কারণে তিনি অ’ন্ধ এবং ব’ধির হয়ে যান, যা তাঁকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। শৈশবে তিনি হতাশা এবং রাগে ভরা ছিলেন, কারণ কোনো যোগাযোগের উপায় ছিল না। কিন্তু তাঁর শিক্ষিকা অ্যান সুলিভানের সাহায্যে তিনি ভাষা শিখেন—প্রথমে হাতের স্পর্শ দিয়ে ‘ওয়াটার’ শব্দটি বোঝেন। এরপর তিনি র‍্যাডক্লিফ কলেজ থেকে স্নাতক হন, যা ছিল অ”ন্ধ-ব’ধির জন্য প্রথম। তিনি লেখক, বক্তা এবং অধিকার কর্মী হয়ে উঠেন, ৬৪টি দেশ ভ্রমণ করেন এবং প্রতিবন্ধীদের অধিকারের জন্য লড়াই করেন। তাঁর আত্মজীবনী “The Story of My Life” পড়লে বোঝা যায়, শারীরিক সীমাবদ্ধতা মনের শক্তিকে আটকাতে পারে না। অভিযোগ: যদি হেলেনের মতো অ’ন্ধ-ব’ধির হয়েও সাফল্য পাওয়া যায়, তাহলে আমাদের ছোট সমস্যা কেন অজুহাত?

২. নেলসন ম্যান্ডেলা (Nelson Mandela)

নেলসন ম্যান্ডেলা ১৯১৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (ANC) এর মাধ্যমে অ্যাপার্থাইড (বর্ণবাদী নীতি) এর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে তাঁকে আজীবন কা’রাদণ্ড দেয়া হয় এবং ২৭ বছর জে’লে কাটান, যেখানে তিনি কঠোর পরিশ্রম করেন এবং নি’র্যাতন সহ্য করেন। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি কোনো প্রতিশোধ নেননি; বরং ক্ষমা এবং ঐক্যের পথ বেছে নেন। ১৯৯৪ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হন এবং নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। তাঁর আত্মজীবনী “Long Walk to Freedom” পড়লে দেখা যায়, কীভাবে জে’লের অন্ধকার থেকে আলোর পথ তৈরি করা যায়। অভিযোগ: ২৭ বছরের কা’রাবাস সহ্য করে যদি বিশ্ব পরিবর্তন করা যায়, তাহলে আমাদের দৈনন্দিন চাপ কেন অভিযোগের কারণ?

৩. মালালা ইউসুফজাই (Malala Yousafzai)

মালালা ১৯৯৭ সালে পাকিস্তানের সোয়াত ভ্যালিতে জন্মগ্রহণ করেন। তালিবানের শাসনে মেয়েদের শিক্ষা নিষিদ্ধ হলে, মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি ব্লগ লিখে প্রতিবাদ করেন। ২০১২ সালে তালিবান তাঁকে গু’লি করে, যাতে তাঁর মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে এবং তিনি মৃ’ত্যুর মুখোমুখি হন। চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হন এবং শিক্ষার জন্য লড়াই চালিয়ে যান। ২০১৪ সালে তিনি সর্বকনিষ্ঠ নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হন। এখন তিনি অক্সফোর্ড থেকে স্নাতক এবং মালালা ফান্ডের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী মেয়েদের শিক্ষা প্রচার করেন। তাঁর আত্মজীবনী “I Am Malala” পড়লে বোঝা যায়, মৃ’ত্যুর ভয়েও স্বপ্ন ছেড়ে দেয়া যায় না। অভিযোগ: যদি ১৫ বছর বয়সে গু’লি খেয়েও লড়াই করা যায়, তাহলে আমাদের ছোট বাধা কেন অভিযোগ?

৪. স্টিফেন হকিং (Stephen Hawking)

স্টিফেন হকিং ১৯৪২ সালে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। ২১ বছর বয়সে তাঁর ALS (Amyotrophic Lateral Sclerosis) রোগ ধরা পড়ে, যা তাঁকে ধীরে ধীরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে। ডাক্তাররা বলেন, তিনি ২ বছরের বেশি বাঁচবেন না। কিন্তু তিনি হুইলচেয়ারে বসে বিজ্ঞানী হয়ে উঠেন, ব্ল্যাক হোল এবং বিগ ব্যাং থিয়োরি নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর বই “A Brief History of Time” বিশ্বব্যাপী বেস্টসেলার। তিনি কম্পিউটারের সাহায্যে কথা বলতেন এবং ৭৬ বছর বেঁচে থেকে বিজ্ঞানকে এগিয়ে নেন। তাঁর জীবনী “My Brief History” পড়লে দেখা যায়, শরীরের দুর্বলতা মনের শক্তিকে হারাতে পারে না। অভিযোগ: যদি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়েও মহাকাশের রহস্য উন্মোচন করা যায়, তাহলে আমাদের স্বাস্থ্যের ছোট সমস্যা কেন অভিযোগ?

৫. ভিক্টর ফ্রাঙ্কল (Viktor Frankl)

ভিক্টর ফ্রাঙ্কল ১৯০৫ সালে অস্ট্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে (যেমন আউশভিৎজ) বন্দী হন। সেখানে তাঁর পরিবারের সবাই মা’রা যান, এবং তিনি নি’র্যাতন, অ’নাহার এবং মৃ’ত্যুর মুখোমুখি হন। কিন্তু তিনি লক্ষ্য করেন, যারা জীবনের অর্থ খুঁজে পান, তারা বেঁচে থাকেন। যু’দ্ধের পর তিনি লোগোথেরাপি তত্ত্ব তৈরি করেন এবং বই “Man’s Search for Meaning” লেখেন, যা ২৪টি ভাষায় অনূদিত। তিনি ৯২ বছর বেঁচে থেকে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অবদান রাখেন। এই বই পড়লে বোঝা যায়, দুর্দশায়ও অর্থ খুঁজে নেয়া যায়। অভিযোগ: কনসেনট্রেশন ক্যাম্প সহ্য করে যদি জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে আমাদের দৈনন্দিন হতাশা কেন?

৬. নিক ভুজিচিচ (Nick Vujicic)

নিক ভুজিচিচ ১৯৮২ সালে অস্ট্রেলিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি টেট্রা-অ্যামেলিয়া সিন্ড্রোমে আক্রান্ত, যার কারণে হাত-পা ছাড়া জন্ম নেন। শৈশবে তিনি বুলিং এবং হতাশায় ভুগেন, এমনকি আ”ত্মহত্যার চেষ্টা করেন। কিন্তু ১৭ বছর বয়সে তিনি মোটিভেশনাল স্পিকার হয়ে উঠেন, “Life Without Limits” সংস্থা গড়েন। তিনি সার্ফিং, সাঁতার এবং ফুটবল খেলেন, বিয়ে করেন এবং ৪ সন্তানের বাবা। তাঁর বই “Life Without Limits” পড়লে দেখা যায়, শারীরিক অভাবও স্বপ্ন আটকাতে পারে না। অভিযোগ: হাত-পা ছাড়া যদি বিশ্ব ভ্রমণ করে অনুপ্রাণিত করা যায়, তাহলে আমাদের সীমাবদ্ধতা কেন অজুহাত?

৭. ওপরাহ উইনফ্রে (Oprah Winfrey)

ওপরাহ ১৯৫৪ সালে আমেরিকার মিসিসিপিতে দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তিনি যৌ’ন নির্যাতন এবং দারিদ্র্য সহ্য করেন, ১৪ বছর বয়সে একটি সন্তান হারান। কিন্তু তিনি রেডিওতে কাজ শুরু করেন এবং “The Oprah Winfrey Show” দিয়ে বিখ্যাত হন, যা ২৫ বছর চলে। তিনি মিলিয়নেয়ার হন, অভিনয় করেন এবং ফিল্যান্থ্রপি করেন। তাঁর জীবনী “What I Know For Sure” পড়লে বোঝা যায়, অতীতের ক্ষত থেকে উঠে আসা যায়। অভিযোগ: নির্যাতন থেকে যদি মিডিয়া সাম্রাজ্য গড়া যায়, তাহলে আমাদের অতীত কেন অভিযোগ?

৮. অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন (Abraham Lincoln)

অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন ১৮০৯ সালে আমেরিকায় দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্যবসায় ব্যর্থ হন, নির্বাচনে হারেন (৮ বার), স্ত্রী এবং সন্তান হারান। কিন্তু তিনি আইনজীবী হন এবং ১৮৬০ সালে প্রেসিডেন্ট হয়ে দাসপ্রথা উচ্ছেদ করেন। তাঁর জীবনী “Team of Rivals” পড়লে দেখা যায়, ব্যর্থতা সাফল্যের সিড়ি। অভিযোগ: অসংখ্য ব্যর্থতা সহ্য করে যদি দেশ পরিবর্তন করা যায়, তাহলে আমাদের ছোট হার কেন?

৯. থমাস এডিসন (Thomas Edison)

থমাস এডিসন ১৮৪৭ সালে আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করেন। স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হন, কারণ শিক্ষকরা মনে করেন তিনি ‘বোকা’। তিনি ১০০০টির বেশি আবিষ্কার করেন, কিন্তু বাল্বের জন্য ১০০০ বার ব্যর্থ হন। তাঁর জীবনী “Edison: A Life of Invention” পড়লে বোঝা যায়, ব্যর্থতা সাফল্যের অংশ। অভিযোগ: হাজার ব্যর্থতা সহ্য করে যদি বিদ্যুৎ আবিষ্কার করা যায়, তাহলে আমাদের ছোট ভুল কেন অভিযোগ?

১০. জে.কে. রাউলিং (J.K. Rowling)

জে.কে. রাউলিং ১৯৬৫ সালে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। বিয়ের পর বিবাহবিচ্ছেদ, দারিদ্র্য এবং ডিপ্রেশনে ভুগেন। ক্যাফেতে বসে “Harry Potter” লেখেন, কিন্তু ১২টি প্রকাশক প্রত্যাখ্যান করেন। অবশেষে বই প্রকাশিত হয় এবং বিশ্বব্যাপী সাফল্য পায়। তাঁর জীবনী “Very Good Lives” পড়লে দেখা যায়, দারিদ্র্য থেকে সাম্রাজ্য গড়া যায়। অভিযোগ: দারিদ্র্য সহ্য করে যদি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী লেখিকা হওয়া যায়, তাহলে আমাদের আর্থিক সমস্যা কেন?

এই জীবনীগুলো পড়ুন, এগুলো শেখাবে, জীবনের অভিযোগ নয়, সংগ্রামই সাফল্যের চাবিকাঠি।

 

পোষ্টটি লিখেছেন: নীরব পথিক

নীরব পথিক এই ব্লগে 41 টি পোষ্ট লিখেছেন .