কৃষ্ণ যজুর্বেদীয় কঠোপনিষৎ- ২/২/১২ মন্ত্র অনুযায়ী ঈশ্বর একজন, তথাপি তিনি বহু রুপ ধারন করেছেন।(“একো বশী সর্বভূতান্তরাত্মা একং রূপং বহুধা যঃ করোতি।-একক বশকর্তা, সর্ব জীবের অন্তরাত্মা,সেই পরমেশ্বর এক তথাপি তিনি বহু রূপ ধারণ করেছেন।”)
কঠোপনিষদের মন্ত্রের মতোই অথর্ববেদ সংহিতা ৯/৪/৯,শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতা ১৩/৪১,সামবেদীয় ছান্দোগ্য উপনিষদ ৬/২/৩,শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতা-৩১/১৯,তৈত্তিরীয় আরন্যক ৩/১৩/১,অথর্ববেদ সংহিতা ১/১/১, ঋগ্বেদ ৬/৪৭/১৮ ইত্যাদি বহুবিধ বেদ মন্ত্র অনুযায়ী ঈশ্বর একজন তথাপি তিনি বহুবিধ অবতার রুপ ধারন করেছেন।বেদ ছাড়াও রামায়ন,
মহাভারত,শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, অষ্টাদশ পুরাণ, পঞ্চরাত্র ইত্যাদি বহুবিধ সনাতনী শাস্ত্র অনুযায়ী ঈশ্বর একজন তথাপি তিনি বহুবিধ রুপ ধারন করেছেন।এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারে বেদ অনুসারে ঈশ্বর তো একজন। তাহলে তিনি কে?তাঁর বিভিন্ন অবতার রুপ সমূহ কি কি?
এ প্রশ্নের উত্তরে অথর্ববেদীয় গোপালতাপনী উপনিষদ আমাদের শিক্ষা প্রদান করছে, ঈশ্বর একজন,তিনিই শ্রীকৃষ্ণ,তিনি আরাধ্য।তিনি এক হওয়া সত্ত্বেও বহুবিধ অবতার রুপ ধারণ করেছেন।
একো বশী সর্বগঃ কৃষ্ণ ঈড্য
একোহপি সন্ বহুধা হো বিভাতি।
-গোপালতাপনী উপনিষদ ১/২১ (অথর্ববেদ)
অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান একজন, তিনিই শ্রীকৃষ্ণ, তিনি আরাধ্য।তিনি এক,তথাপি তিনি বহুবিধ অবতার রুপে প্রকাশিত হন।
বেদোক্ত একই কথা শ্রীমদ্ভগবদগীতার ৪/৬,৭,৮ শ্লোকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং নিজমুখে বর্ণনা করেছেন-
অজোহপি সন্নব্যায়িত্মা ভূতানামীশ্বরোহপি সন।
প্রকৃতিং স্বামহধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া।।
যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানি ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম।।
পরিত্রানায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।
– (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪/৬,৭,৮)
অনুবাদঃ হে অর্জুন, যদিও আমি সমস্ত জীবের ঈশ্বর,যদিও আমার জন্ম নেই ( অজ)এবং আমার চিন্ময় দেহ অব্যয় ।তবুও আমি আমার অন্তরঙ্গ শক্তিকে আশ্রয় করে অবতীর্ণ হই। যখনই জগতে ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের পরিমান বেড়ে যায়,তখনই সাধুদের (ভক্ত) রক্ষা ও দুষ্কৃতিকারীদের বিনাশ এবং ধর্ম সংস্থাপন হেতু যুগে যুগে অবতীর্ন হই।
বেদ, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার মতোই সমগ্র সনাতনী শাস্ত্র অনুসারে সে এক পরমেশ্বর হলেন শ্রীকৃষ্ণ। তিনি দুষ্টের দমন,শিষ্টের পালন এবং ধর্ম সংস্থাপন হেতু শ্রীবিষ্ণু, শ্রীরাম,শ্রীবলরাম,শ্রীবামন,শ্রীনৃসিংহ, শ্রীবরাহ,শ্রীকূর্ম ইত্যাদি বহু অবতার রুপে নিজেকে প্রকাশ করেন।
এ সম্পর্কে ব্রহ্মসংহিতা শাস্ত্রে বলা হয়েছে –
দীপার্চ্চিরেব হি দশান্তরমভ্যুপেত্য
দীপায়তে বিবৃতহেতুসমানধৰ্ম্মা।
যস্তাদৃগেব হি চরিষ্ণুতয়া বিভাতি
গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি।।৪৬।।
-(ব্রহ্মসংহিতা ৫/৪৬)
অনুবাদঃ এক মূল প্রদীপের জ্যোতিঃ(অগ্নি) যেমন অন্য বর্তি বা বাতি-গত হয়ে বিস্তার (বিবৃত) হেতু সমান ধর্মের সাথে পৃথক প্রজ্বলিত হয়, সেইরূপ যিনি বিষ্ণুরুপে( রিষ্ণু) প্রকাশ পান, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে (শ্রীকৃষ্ণ) আমি ভজনা করি ।
যস্যৈকনিশ্বসিতকালমথাবলম্ব্য
জীবন্তি লোমবিলোজা জগদগুনাথাঃ।
বিষ্ণুর্মহান্ স ইহ যস্য কলাবিশেষো
গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি ।।৪৮
-(ব্রহ্মসংহিতা ৫/৪৮)
অনুবাদঃ মহাবিষ্ণুর একটি নিশ্বাস বের হয়ে যে কাল পর্যন্ত অবস্থান করে, তাঁর রোমকূপজাত ব্রহ্মাণ্ডপতি ব্রহ্মাদি সেই-কালমাত্র জীবিত থাকেন। সেই মহাবিষ্ণু-যাঁর কলাবিশেষ অর্থাৎ অংশের অংশ, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে (শ্রীকৃষ্ণ)আমি ভজনা করি।।
রামাদিমূর্তিষু কলানিয়মেন তিষ্ঠন
নানাবতারমকরোদ্ভূবনেষু কিন্তু।
কৃষ্ণ স্বয়ং সমভবৎ পরমঃ পুমান্ যো
গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি ॥ ৩৯ ॥
-(ব্রহ্মসংহিতা৫/৩৯)
অনুবাদঃ যে পরমপুরুষ স্বাংশ কলাদি নিয়মে রাম, নৃসিংহ ইত্যাদি মূর্তিতে স্থিত হয়ে ভুবনে নানাবতার প্রকাশ করেছিলেন এবং স্বয়ং কৃষ্ণরূপে প্রকট হয়েছিলেন, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে (শ্রীকৃষ্ণ)আমি ভজনা করি।