শুকদেব গোস্বামী ছিলেন বেদব্যাস মুনির পুত্র এবং তিনি ‘ব্রহ্মজ্ঞানী’ ও ‘ব্রহ্মনিষ্ঠ’ রূপে প্রসিদ্ধ। তাঁর জন্ম অলৌকিক এবং সাধারণ মানব জন্মের ঊর্ধ্বে।
১. বেদব্যাসের আকাঙ্ক্ষা ও তপস্যা
পিতার পরিচয়: শুকদেব গোস্বামীর পিতা হলেন মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস—যিনি বেদ, পুরাণ, মহাভারত এবং শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের সংকলক।
পুত্র লাভের আকাঙ্ক্ষা: বেদব্যাস মনে মনে একজন পবিত্র, ব্রহ্মজ্ঞানী এবং নিজের মতোই শ্রেষ্ঠ পুত্র লাভের বাসনা পোষণ করতেন, যিনি তাঁর জ্ঞান ও বংশকে রক্ষা করবেন।
তপস্যা: এই পুত্র লাভের জন্য বেদব্যাস হিমালয়ে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। তিনি মহাদেবের (শিব) আরাধনা করেন।
২. শিবের বরদান ও অলৌকিক জন্ম
মহাদেবের আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে শিব তাঁকে বর প্রদান করেন:
শিবের বর: মহাদেব বর দিলেন যে, বেদব্যাস এমন এক পুত্র লাভ করবেন যিনি হবেন ‘ব্রহ্মজ্ঞানী’ এবং ‘ব্রহ্মনিষ্ঠ’। এই পুত্র হবেন স্বয়ং শিবের অংশ।
অগ্নি মন্থন ও শুকের জন্ম: শাস্ত্র অনুসারে, যখন বেদব্যাস মুনির ধ্যান সম্পূর্ণ হলো, তখন তিনি কাঠের দুটি টুকরা মন্থন (ঘর্ষণ) করে অগ্নি উৎপন্ন করছিলেন (প্রাচীনকালে যেমন যজ্ঞের জন্য অগ্নি উৎপন্ন করা হতো)। এই মন্থনের সময়, সেই অগ্নিতেজ থেকে এক দৈব শিশু রূপে শুকদেব গোস্বামী জন্মগ্রহণ করেন।
(অন্য একটি প্রচলিত মত হলো, শিবের বরের প্রভাবে বেদব্যাসের স্ত্রীর গর্ভ থেকে শুকদেব আবির্ভূত হন, তবে সেখানেও তাঁকে দৈবশক্তি রূপে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু ‘ভাগবত পুরাণ’ অনুসারে, তিনি শিবের অংশ এবং মন্থন থেকেই উৎপন্ন হন।)
শুকদেব নাম: যেহেতু তিনি ‘শুক’ (সংস্কৃতে টিয়াপাখি) নামক এক বৃক্ষ থেকে নির্গত হয়েছিলেন (মতান্তরে সেই সময় একটি টিয়াপাখি তাঁর জন্ম প্রত্যক্ষ করেছিল), তাই তাঁর নাম হয় শুকদেব।
৩. জন্মেই ব্রহ্মজ্ঞানী ও ব্রহ্মচারী
শুকদেব গোস্বামীর সবচেয়ে বড় অলৌকিকত্ব হলো তাঁর জন্মলগ্নের জ্ঞান।
ব্রহ্মজ্ঞান: তিনি পৃথিবীতে এসেই ব্রহ্মজ্ঞানী ছিলেন। জন্ম থেকেই তিনি জাগতিক মায়া ও বন্ধন থেকে মুক্ত ছিলেন।
তাৎক্ষণিক প্রস্থান: জন্ম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বুঝতে পারেন যে, এই জগৎ হলো মায়ার খেলা। তাই তিনি কোনো কিছুর প্রতি আসক্তি না দেখিয়ে, এমনকি পিতা-মাতার মায়া বন্ধনেও আবদ্ধ না হয়ে, জন্মের পরেই ব্রহ্মজ্ঞান লাভের জন্য ঘর ছেড়ে বনের দিকে গমন করেন।
৪. বেদব্যাসের আকাঙ্ক্ষা ও পিছু ধাওয়া
বেদব্যাসের আর্তনাদ: পুত্রকে এভাবে যেতে দেখে বেদব্যাস মায়া ত্যাগ করতে পারলেন না এবং ব্যাকুল হয়ে পুত্রকে ডাকতে শুরু করলেন: “হে পুত্র, ফিরে এসো!”
অলৌকিক প্রতিধ্বনি: তখন বনের বৃক্ষগুলি থেকে প্রতিধ্বনি এলো, “আমি ফিরে এসেছি।” কারণ শুকদেব ছিলেন সর্বত্র বিরাজমান ব্রহ্মের সঙ্গে যুক্ত।
চূড়ান্ত ব্রহ্মজ্ঞান: পরে শুকদেব গোস্বামী তাঁর পিতা বেদব্যাসের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ শ্রবণ করেন এবং তাতেই তিনি পূর্ণতা লাভ করেন।
শুকদেব গোস্বামীর জন্ম এই শিক্ষা দেয় যে, তিনি ছিলেন এক নিত্যসিদ্ধ পুরুষ, যিনি জাগতিক নিয়মের ঊর্ধ্বে থেকে কেবল ব্রহ্মজ্ঞান প্রচারের জন্যই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি হলেন ব্রহ্ম-স্বরূপ এবং শ্রেষ্ঠ বক্তা, যাঁর মুখ থেকে শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ নির্গত হয়েছিল।