“ভগবান, ইষ্ট বা ধর্ম্মের মৌখিক স্তুতির ভিতর-দিয়ে যা’রা ধৰ্ম্মবিরোধী কাজ করে, তা’রা হ’ল সব চাইতে বড় শয়তানের দূত-প্রকৃষ্ট লোক-দূষক।” ১২৫।
(শাশ্বতী অখণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭)
“আমি যেগুলি আপনাদের দিছি, সেগুলি বুঝে সেই- মতো যদি চলেন তাহ’লে দেখবেন বেকুব বোধ, বেকুব চলন ও বিরুদ্ধশক্তি আপনাদের বিধ্বস্ত ক’রতে এসে হতাশ হ’য়ে যাবে।”
(আঃ প্রঃ ৯। ১৮৪)
আমি যা’ দিয়ে গেলাম সেই দাঁড়াগুলি যদি ঠিক থাকে, তা’হলে নিত্য-নিত্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা কম।”(আঃ প্রঃ ৩। ১১৪)
“আমার সবই লেখা আছে ছড়ায় ও গদ্যে। আমার বুদ্ধি-আমি না থাকলেও যেন মানুষ আমার সাথে কথা বলতে পারে।” (৬ শ্রাবণ শনিবার ১৩৬৮, ইং ২২-৭-৬১ আলোচনা-আশ্বিন ১৩৭৬)
- প্রশ্ন-যদি কেউ এক-কথায় জানতে চায়, সৎসঙ্গের লক্ষ্য কী? তাহ’লে কি বললে ঠিক হয়?
শ্রীশ্রীঠাকুর–বলা যায়-যাতে পরিবেশের সবাইকে নিয়ে আমাদের সত্তা বিধৃত হয়, বজায় থাকে, তাই করাই সৎসঙ্গের লক্ষ্য। (আঃ প্রঃ ৮। ১১৬)
- প্রশ্ন-আমাদের অনেক জায়গায় যে পূজা-আর্চ্চা করে, আর কিছু করে না, তাতে কি হয়?
শ্রীশ্রীঠাকুর—-শুধু ওইটুকুই সব নয়, তবুও মন্দের ভাল। অবশ্য, মাত্র ওতেই সমাজ উন্নতিমুখর হ’য়ে চলতে পারে না। যে দেবদেবীর আনুষ্ঠানিক পূজা করা হয়, তিনি যে-গুণ ও শক্তির প্রতীক, ভক্তির সঙ্গে বাস্তবে সেইসব গুণ ও শক্তির অনুশীলন করতে হয়। আচরণ-সিদ্ধ গুরু চাই, গুরুনিষ্ঠা চাই। (আঃ প্রঃ ৮। ১৮৬)
- প্রশ্ন-প্রাজ্ঞ ও তথাকথিত বিদ্বানদের মধ্যে তফাৎ হয় কেন?
শ্রীশ্রীঠাকুর—-নিষ্ঠাবান যাঁরা, প্রাজ্ঞ যাঁরা, তাঁদের বিদ্যা থাক বা না থাক, বোধ থাকে। সে-বোধ, তাদের first hand observation ও experience(প্রত্যক্ষপৰ্য্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা) থেকে পাওয়া। শুধু তাই নয়, তা’ তাঁদের সত্তায় গাঁথা হ’য়ে থাকে। অবস্থার ফেরে প’ড়ে পালটে যায় না। বিদ্বানরা নানা জনের নানা কথা, নানা তথ্য সংগ্রহ ক’রে মস্তিস্কে সজ্জিত ক’রে রাখে। সেগুলি নিজের দাঁড়ায় বোধ করে কমই। তাই সত্তার সঙ্গে জড়ায় না। বিদ্যা যদি বোধ- সমন্বিত হয় খুবই ভাল, নইলে বোধহীন বিদ্যার কোন দাম নেই। বোধ আসে আচরণ থেকে। একজন হয়তো নীতিকথা আওড়ায়, আচরণ করে না। তাতে কিন্তু ঐ নীতি-সম্বন্ধে বোধ গজাবে না। সে-সম্বন্ধে সত্যিকার বোধ একবার ফুটে উঠলে, ব্যতিক্রমী চলন তার পক্ষে সম্ভবই হবে না।
(আলোচনা- প্রসঙ্গে, ৮। ১১৮)
- প্রশ্ন-গৌরববোধ ও অন্তঃসারশূন্য অহমিকার তফাৎ কী?
শ্রীশ্রীঠাকুর—-অহমিকা জাগে ছোট আমিকে নিয়ে, ওর পিছনে থাকে প্রবৃত্তি-আবিষ্টতা। গৌরববোধ জাগে শ্রেয়কে নিয়ে, ওর পিছনে থাকে সত্তা-সংক্ষুধতা। ‘তোমারই গরবে গরবিনী হাম, রূপসী তোমারই রূপে’। (আলোচনা- প্রসঙ্গে,৮। ১০৫)
- প্রশ্ন-সংসারে নানা জনের নানা বুদ্ধি, নানা মত, নানান চাহিদা। এর মধ্যে প’ড়ে কি করি?
শ্রীশ্রীঠাকুর—-যত পারবি, সবাইকে পূরণ করবি-নিজেকে অক্ষত রেখে, সততাকে সাবুদ ক’রে। কিন্তু চলবি তুই তোর ইষ্ট পথে, তাঁরই মতে। অন্যকে না চটিয়ে, কুশল-কৌশলে, মিষ্টি ব্যবহার নিয়ে, কিন্তু নিষ্ঠায় নিনড় হ’য়ে। ইষ্টনিষ্ঠ না হ’লেই মানুষ অব্যবস্থিত হয়, এলোমেলো হয়, কখনো নিজের খেয়ালে চলে, কখনও অন্যের খেয়ালে চলে, চিত্তের কোন স্থিরতা থাকে না। সে নির্ভরযোগ্য লোক হয় না। (আলোচনা- প্রসঙ্গে, ৮। ২৬৮)
- প্রশ্ন-সৎসঙ্গী কাদের বলা যায়?
শ্রীশ্রীঠাকুর—-প্রত্যেকটা মানুষই কার্যতঃ সৎসঙ্গী, কারণ অস্তিত্বের বিধি অল্পবিস্তর না মানলে কারও অস্তিত্ব থাকে না। (আলোচনা- প্রসঙ্গে, ১১। ১৮৪)
আমি সৎসঙ্গী তার মানে হ’চ্ছে আমি প্রত্যেকের জীবন- বৃদ্ধির সঙ্গী। সৎসঙ্গী হওয়া মানে সবার বাঁচা-বাড়ার সেবক হওয়া। (আলোচনা- প্রসঙ্গে, ৯। ৫৫)
- ভাটপাড়ার একটি দাদা বললেন-— কেউ যদি বলে ঠাকুর ধ’রে তোমার তো এই অবস্থা, ঠাকুর ধ’রে কী হবে?
শ্রীশ্রীঠাকুর-—কেউ যদি বলে ঠাকুর ধ’রে তোমার তো এই অবস্থা, তবে তাকে ব’লো- এখনও ঠাকুরকে ধরিনি, ধরতে চেষ্টা ক’রছি। ঠিকমত ধ’রতে পারলে, তার পথে চ’লতে পারলে থাকবে না দূরাবস্থা। এখনও প্রবৃত্তির সঙ্গে দর কষাকষি করছি। প্রবৃত্তি যখনই লোভ দেখাচ্ছে, তখনই তার কাছে নতি স্বীকার করছি।
[আলোচনা প্রসঙ্গে-৯ম খণ্ড, ১৪/০৮/১৯৪৭-বৃহস্পতিবার]
- প্রশ্ন-—দল করা কি ভাল?
শ্রীশ্রীঠাকুর—-ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলতেন -স্রোতের জলে দল হয় না, গেড়ে ডোবার বদ্ধ জলে দল হয়। যার মন ঈশ্বর পা’বার জন্য দৌড়েছে, তার আর কোনদিকে দৃষ্টি থাকে না। যে মান-সম্ভ্রমের দিকে চেয়ে আছে, সেই দল বাঁধতে যায়।
(শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের উপদেশামৃত)