একাদশী ব্রত ভারতীয় সংস্কৃতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ আচার, যা বহু যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে। সাধারণত, একাদশী ব্রতে উপবাস পালন করা হয় এবং বলা হয় যে এটি পালন করলে পূণ্য হয়, আর না করলে পাপ হয়। কিন্তু শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র একাদশী ব্রতের পরিবর্তে হবিষ্যান্ন ব্রত পালনের উপর জোর দিয়েছেন। তিনি কেন এই পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিলেন? এ বিষয়ে শাস্ত্রীয়, বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা প্রয়োজন।
একাদশী ব্রতের প্রকৃত অর্থ ও শাস্ত্রীয় ভিত্তি
“একাদশী” শব্দটির বিশ্লেষণ করলে পাই— “এক + আদশী”, অর্থাৎ এক আদেশে চলা, বলা ও করা। প্রকৃত অর্থে, একাদশীর ব্রত শুধু খাদ্য ত্যাগ নয়, বরং ইষ্টানুরাগী হয়ে চিন্তা, বাক্য ও কর্মকে ইষ্টমুখী করাই একাদশীর মূল দর্শন।
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণে বলা হয়েছে যে, একাদশী ব্রতের মাধ্যমে মানুষের সংযম বৃদ্ধি পায় এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা উন্নত হয়। তবে একাদশীর প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধুমাত্র উপবাস নয়, বরং ঈশ্বরচিন্তা, আত্মশুদ্ধি ও ইষ্টভক্তি বৃদ্ধি করা।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় বলেছেন—
“নাদত্তি কস্যচিত্ পাপং ন চৈব সুকৃতং বিভুঃ।
অজ্ঞানেনাবৃতং জ্ঞানং তেন মুহ্যন্তি জন্তবঃ।।” (গীতা ৫.১৫)
অর্থাৎ, ঈশ্বর কারও পাপ বা পূণ্য প্রদান করেন না। পাপ ও পূণ্য আমাদের নিজের কর্মের ফল। তাই শুধুমাত্র উপবাস করলেই পূণ্য হয় না, বরং যথাযথ জীবনাচরণই পূণ্য এবং ভুল পথ গ্রহণ করাই পাপ।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে একাদশী ব্রত
একাদশীর দীর্ঘ উপবাস মানবদেহের বিপাকীয় কার্যকলাপের উপর প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ সময় না খেলে শরীরে গ্লুকোজের পরিমাণ কমে গিয়ে শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষত, যাদের দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততা বেশি, তাদের জন্য উপবাস ক্ষতিকর হতে পারে।
একাদশীর উপবাসে রক্তচাপ কমে যাওয়া, শক্তিহীনতা, ক্লান্তি এবং কখনো কখনো হজমজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিজ্ঞান বলছে, সুস্থ থাকার জন্য নিয়মিত ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন, যা উপবাসের মাধ্যমে সম্ভব নয়।
।হবিষ্যান্ন ব্রতের শাস্ত্রীয় গুরুত্ব।
শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র একাদশী ব্রতের পরিবর্তে হবিষ্যান্ন ব্রত পালনের উপর জোর দিয়েছেন। হবিষ্যান্ন বলতে বোঝায় বিশুদ্ধ, সহজপাচ্য ও নিরামিষ আহার, যা শরীরের জন্য পুষ্টিকর এবং মানসিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
মনুস্মৃতি (২.১৭)-তে বলা হয়েছে—
“হবিষ্যান্নং সদা গ্রাহ্যং ব্রাহ্মণেন বিশেষতঃ।”
অর্থাৎ, বিশেষ করে সাধক ও ব্রাহ্মণদের জন্য হবিষ্যান্ন গ্রহণ করা শ্রেয়।
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ (১১.৩.৫২)-এ বলা হয়েছে—
“হবিষ্যান্নমশ্নীতোদ্বিজঃ”
অর্থাৎ, যারা ইষ্টভক্তিতে লিপ্ত, তাদের জন্য হবিষ্যান্ন গ্রহণ করা শ্রেয়।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলেছেন—যা’ ক’রলে আস্তিত্বকে রক্ষা করা হয় তাই পূণ্য।
যা’ ক’রলে রক্ষা হ’তে পতিত হয়-তা পাপ।
যার অস্তিত্ব আছে এবং তার বিকাশ আছে- তাই সত্য (Real) —(সত্যানুসরণ গ্রন্থ)
এই বাণী অনুযায়ী, যদি শুধুমাত্র উপবাস করার ফলে শরীর ও কর্মশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ইষ্টসেবা ব্যাহত হয়, তবে তা অস্তিত্ববিরুদ্ধ এবং পাপের পর্যায়ে পড়ে।
।বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে হবিষ্যান্ন ব্রতঃ।
বিজ্ঞান বলে, সহজপাচ্য, পরিমিত ও বিশুদ্ধ খাদ্য গ্রহণ শরীরের জন্য উপকারী। হবিষ্যান্ন, অর্থাৎ সিদ্ধ শাক-সবজি, দুধ, ফল ইত্যাদি গ্রহণ করলে—
হজমে সহায়ক হয়।
শরীর পর্যাপ্ত শক্তি পায়।
রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে।
মানসিক স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
অন্যদিকে, দীর্ঘ উপবাস শরীরে কীটোন উৎপাদন বাড়িয়ে ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদ সৃষ্টি করতে পারে। তাই হবিষ্যান্ন গ্রহণ করলে ইষ্টসেবা ও দৈনন্দিন কাজ সহজ হয়।
শ্রীশ্রী ঠাকুর বলেছেন—
“উপবাস করা মানে ইষ্টের সঙ্গে বাস করা।”
অর্থাৎ, শুধুমাত্র খাদ্য ত্যাগ করলেই উপবাস হয় না। বরং ইষ্টের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া, ইষ্টচিন্তা করা, ইষ্টস্বার্থে জীবন পরিচালনা করাই প্রকৃত উপবাস। যদি খাদ্য ত্যাগ করায় দেহ ও মন দুর্বল হয়ে যায় এবং ইষ্টসেবা ব্যাহত হয়, তবে তা প্রকৃত উপবাস নয়।
শ্রীশ্রীঠাকুরের দর্শন অনুসারে, ব্রত মানে জীবনশক্তির সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবহারের ব্যবস্থা করা। হবিষ্যান্ন ব্রত ইষ্টভক্তি ও শারীরিক সুস্থতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে, যা প্রকৃত ব্রত পালনের জন্য জরুরি।
উপসংহার—
একাদশী ব্রতের মূল উদ্দেশ্য হলো আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ইষ্টভক্তি বৃদ্ধি করা। কিন্তু শুধুমাত্র উপবাস করলে যদি শরীর দুর্বল হয় এবং ইষ্টসেবা ব্যাহত হয়, তবে সেটি প্রকৃত ব্রত হতে পারে না। হবিষ্যান্ন ব্রত শাস্ত্রসম্মত, স্বাস্থ্যসম্মত এবং আধ্যাত্মিকভাবে উপযোগী।
শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র একাদশী ব্রতের পরিবর্তে হবিষ্যান্ন ব্রতকে শ্রেয় বলেছেন, কারণ—
1. এটি শরীরকে দুর্বল না করে কর্মক্ষমতা বজায় রাখে।
2. বৈজ্ঞানিকভাবে এটি স্বাস্থ্যকর ও সহজপাচ্য।
3. শাস্ত্র অনুযায়ী হবিষ্যান্ন ব্রত ব্রাহ্মণ ও সাধকদের জন্য শ্রেয়।
4. ইষ্টচিন্তা ও ইষ্টসেবা সহজ হয়।
5. উপবাস মানে কেবল খাদ্য ত্যাগ নয়, বরং ইষ্টের সাথে যুক্ত হওয়া।
অতএব, হবিষ্যান্ন ব্রত প্রকৃত উপবাসের প্রকৃষ্ট পন্থা, যা শাস্ত্রসম্মত, বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য সহায়ক।