শঙ্করের বেদান্ত দর্শন
আদি শংকরাচার্য উপনিষদ-গীতা-ব্রহ্মসূত্রের ওপর ভিত্তি করে অদ্বৈত বেদান্ত প্রতিষ্ঠা করেন। এর মূল কথা—
১। ব্রহ্ম সর্বস্ব
- এই সৃষ্টিতে একমাত্র সত্য নির্গুণ, নিরাকার, চৈতন্যময় ব্রহ্ম।
- উপনিষদের বাক্য— “ব্রহ্ম সত্যং জগৎ মিথ্যা, জীবো ব্রহ্মैব নাপরঃ”—এই দর্শনের সারসংক্ষেপ।
২। জগত মিথ্যা (মায়া)
- জগত অস্তিত্বহীন নয়, কিন্তু পরমার্থে সত্য নয়—এটি মায়ার সৃষ্টি।
- মায়া অনাদি, অবিদ্যার শক্তি; ব্রহ্মে আরোপিত বিভ্রান্তি হিসেবে জগৎ প্রকাশ পায়।
৩। জীব-ব্রহ্ম ঐক্য
- প্রতিটি জীবের আসল সত্তা আত্মা = ব্রহ্ম।
- পার্থক্য কেবল অবিদ্যার কারণে, তাই মুক্তি মানে অবিদ্যা নাশ।
৪। মুক্তির পথ – বেদান্তজ্ঞান
- জ্ঞান, মনন, নিদিধ্যাসন—এই তিনের মাধ্যমে “তৎ ত্বম্ অসি”, “অহম্ ব্রহ্মাস্মি” প্রভৃতি মহাবাক্যের সত্য উপলব্ধি হলে অবিদ্যা নাশ হয়, এবং জীব জীবনকালেই জ্ঞানমুক্ত হতে পারে।
৫। ঈশ্বর-জীব-জগতের সম্পর্ক
- ঈশ্বর হলেন মায়াসহ ব্রহ্ম (সগুণ ব্রহ্ম)।
- মুক্তির পরে সগুণ-নির্গুণ ভেদ লয় হয়ে যায়।
শঙ্করের দর্শনের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ
🔹 ১. জগত মিথ্যা বলা—ব্যবহারিকভাবে অগ্রহণযোগ্য
- রামানুজ, মাধ্ব, ভল্লভ প্রমুখ বৈষ্ণব আচার্য বলেন—
জগত যদি “মিথ্যা” হয়, তবে ধর্ম, কর্ম, নৈতিকতা—সবই অর্থহীন হয়ে পড়ে। - জগতকে “অনির্বচনীয়” বলা একটি দার্শনিক এড়িয়ে-যাওয়া (evasiveness) হিসেবে সমালোচিত।
🔹 ২. ব্যক্তি-ঈশ্বর ভেদের অভাব devotion-এর ভিত্তি দুর্বল করে
- ভক্তি আন্দোলনের আচার্যদের মতে—
যদি জীব ও ঈশ্বর একই হন, তবে প্রেম/ভক্তির দ্বৈত সম্পর্ক (ভক্ত-ভগবান) থাকে কোথায়? - রামানুজাচার্যের “বিশিষ্টাদ্বৈত” এই কারণেই ব্যক্তিকে ঈশ্বরের গুণধর্মী অংশ হিসেবে মানে।
🔹 ৩. ঈশ্বর ও মায়ার সম্পর্ক অস্পষ্ট
- প্রশ্ন: মায়া যদি শুরুহীন হয়, তবে তা ব্রহ্ম থেকে ভিন্ন হলে দ্বৈতবাদ তৈরি হয়।
- আবার মায়া ব্রহ্মের হলে নিতান্ত অশুদ্ধ কিছু ব্রহ্মের সাথে যুক্ত হয়— যা শঙ্করের নির্গুণ-ব্রহ্ম ধারণার সঙ্গে যায় না।
🔹 ৪. ‘অবিদ্যা’ কার— ব্যক্তির না ব্রহ্মের?
- যদি অবিদ্যা জীবের, তবে জীব-ব্রহ্ম অভেদ কেন উপলব্ধ হয় না?
- যদি অবিদ্যা ব্রহ্মের, তবে সর্বজ্ঞ ব্রহ্মের মধ্যে অজ্ঞান থাকার প্রশ্ন ওঠে—যা গ্রহণযোগ্য নয়।
- শঙ্করাচার্য “আবর্তিত অজ্ঞেয় অবস্থা” বলে ব্যাখ্যা করলেও বহু মীমাংসক এটিকে অসংগত বলেন।
🔹 ৫. অহম্ ব্রহ্মাস্মি উপলব্ধি কঠিন ও সীমিত
- শঙ্করের পথ “জ্ঞানযোগ”মূলক, অত্যন্ত কঠিন ও বুদ্ধিনির্ভর—
সাধারণ মানুষের জন্য এটি অল্পই গ্রহণযোগ্য। - ভক্তি ও কর্মযোগের জনপ্রিয়তা এই কঠোরতা থেকে অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়।
🔹 ৬. কর্ম-যজ্ঞ-শাস্ত্রবিধির মূল্য কমে যায়
- অদ্বৈত মতে মুক্তির জন্য কর্ম অপরিহার্য নয়—
ফলে বেদবিধির ব্যবহারিক দিকগুলো গুরুত্বহীন বলে মনে হয়। - প্রাচীন মীমাংসকরা এটিকে বেদশাসনের অবমাননা হিসেবে দেখেছেন।
⭐ উপসংহার
শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত বেদান্ত ভারতীয় দার্শনিক ইতিহাসে এক অনন্য শিখর।
এটি গভীর যুক্তি, উপনিষদ-তত্ত্বের উপর ভিত্তি ও পরম সত্যের অনুসন্ধানে অতুলনীয়।
তবে এর
- জগত-মিথ্যা তত্ত্ব,
- মায়ার অস্পষ্টতা,
- ভক্তি-সাধনার উপযোগিতা কম,
- ঈশ্বর-জীব সম্পর্কের অদ্বৈত যুক্তি
ইত্যাদি কারণে অন্যান্য বৈদান্তিক আচার্যরা সমালোচনা করেছেন এবং
বিভিন্ন বিশিষ্টাদ্বৈত, দ্বৈত, শুদ্ধাদ্বৈত, দ্বৈতাদ্বৈত মতবাদ গড়ে উঠেছে।